নতুন উদ্ভাবন নতুন বিনিয়োগ

নতুন উদ্ভাবন নতুন বিনিয়োগ

untitled-10_141102
এসএম আশরাফ আবির
মানুষ জায়গা-জমি বিক্রি করে বিদেশ চলে যাচ্ছে। তরুণরা নৌপথে সাগর পাড়ি দিয়ে দিনের পর দিন না খেয়ে, জীবন বাজি রেখে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াচ্ছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া গিয়ে কেউ সর্বস্ব হারিয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরছে আবার কারো ঠাঁই হচ্ছে গণকবরে। কিন্তু আমরা কেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ড যাচ্ছি? আমাদের দেশে কি কর্মসংস্থান নেই? ইন্টারনেটের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের চেয়েও উন্নত দেশের বিলিয়ন ডলারের আইটি বাজার এখন দেশে বসেই ধরা সম্ভব। শুধু দরকার সদিচ্ছা ও কিছু উদ্যোগ। বিদেশ যাওয়ার জন্য আমরা যতো ত্যাগ শিকার করছি; দেশে কিছু করার জন্য তা করছি?
অন্য যে কোনো কাজে সীমাহীন ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা নেই; কিন্তু যদি বলা হয়, আসুন একটি সফটওয়্যার কোম্পানি করি। তাহলে দুই পয়সার ঝুঁকি নিতে আমরা রাজি হই না। আমাদের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন শিল্পে একটা প্রচলিত ধারণা, বিদেশিরা কাজ দেবে আর সেই কাজ করে আমরা ডলার কামাব। ব্যবসার ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে একটি ধারণা হলো, বিনিয়োগ শুরু করতে হবে আগে নিজের থেকে, পরিবার থেকে। স্টার্টআপ কনসেপ্টে আগে সাধারণত উদ্যোক্তা নিজে বিনিয়োগ করে, তারপর বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এগিয়ে আসে। এর পর বাইরের লোকজন আসে। সেই বিনিয়োগের পরিবেশ আমাদের তৈরি করতে হবে। নিজেদের মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে। তবে বিনিয়োগ প্রধান সমস্যা নয়, আগে উদ্ভাবন করতে হবে।
বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি এখনো সার্ভিসপ্রধান। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের মতো ছোট বা মাঝারি কোম্পানিগুলো অন্যের জন্য সফটওয়্যার বা বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা দিয়ে নিজেদের মেধা খরচ করছি। যারা নতুন শুরু করেছি তাদের অনেককেই বলতে শুনি, সেবা দিয়ে যে রেভিনিউ হবে সেখান থেকে নিজেদের একটা প্রডাক্ট তৈরি করব অথবা বিনিয়োগের জন্য অপেক্ষা। আমাদের মতো একই ভুল করা যাবে না। বিলিয়ন ডলারের মোবাইল অ্যাপের বাজার ধরার প্রধান শর্ত হচ্ছে প্রোডাক্টনির্ভর কোম্পানি গড়ে তুলতে হবে শুরু থেকেই। হতে পারে আইডিয়াগুলো বাস্তবায়ন হবে দেশে; কিন্তু ভবিষ্যতে স্কেলআপ করা যাবে সারাবিশ্বে। ছোট বড় মাঝারি মিনি মাইক্রো মেগা_ যে কোনো আইডিয়া মোবাইল অ্যাপ, ই-কমার্স সফটওয়্যার প্রোডাক্ট, বিনিয়োগের আশা না করেই শুরু করে দেওয়া উচিত। নিজের ইনোভেশনে যদি আপনার বিশ্বাস থাকে তাহলে নিজের জমানো বা ধার করে, জায়গা-জমি বিক্রি করে নেমে পড়তে হবে (ইড়ড়ঃ ঝঃৎধঢ়ঢ়রহম ণড়ঁৎ ঝঃধৎঃঁঢ়) এবং লেগে থাকতে হবে। দুই দিন পর যারা বিনিয়োগ করবেন তারাই খুঁজে নেবে আপনাকে। প্রোডাক্ট ইনোভেশন নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় এখন জোর দেওয়ার সময় হয়েছে।
বিনিয়োগ পাওয়ার পর প্রোডাক্ট তৈরির আগে গবেষণা করতে হবে। চিন্তা করতে হবে, আমার এখানে আমি কাদের জন্য অ্যাপ তৈরি করব। এটা কি দেশের মানুষের জন্য, না বিদেশের জন্য। এমন জিনিস তৈরি করতে হবে যাতে পৃথিবীর সব সাধারণ মানুষের কাজে লাগে। অ্যাপ বানালেই হবে না, তার মার্কেটিং করতে হবে। মার্কেটিং মানেই টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিতে হবে, তা নয়। আগে নিজের বন্ধু-বান্ধবকে তাদের সার্কেলে পরিচিত করতে বলা যেতে পারে। বিষয়গুলো এভাবেও শুরু করা যেতে পারে। আপনি যদি নিজে নিজে নিজস্ব সম্পদ দিয়ে কাজ শুরু করেন তাহলে মানুষ দেখবে আপনি পাঁচতলা বানিয়ে ফেলেছেন, চলেন আপনাকে ২০ তলায় নিয়ে যাই। আর আপনি যদি নিজে নিজে চিন্তা করেন আপনি এক তলায় উঠবেন কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে ওঠেননি তাহলে বিনিয়োগকারী আপনাকে কেন বিশ্বাস করবে?
যারা দেশের বাজার নিয়ে কাজ করতে চান তাদের বাজারও তৈরি করতে হবে। বাজার তৈরি হলে যতো ব্যবহারকারী বাড়বে বাজারের রেটও ততো বাড়বে। আমাদের দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ১২ কোটি ৩৬ লাখ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ৪ কোটি ৪০ লাখের মতো। এ পরিসংখ্যানেই দেখা যায়, এখনো কতো মোবাইল ফোন ইন্টারনেট সেবার বাইরে। আমি ইউরোপের মার্কেটের জন্য অ্যাপ বানাচ্ছি। কিন্তু সেখানে
যতো মানুষ অ্যাপটি ব্যবহার করবে তার চেয়ে বেশি মানুষ আমাদের অঞ্চলেই আছে। তাহলে অ্যাপ থেকে অ্যাডভার্টাইজমেন্টের যে আয় তা অনেক বেশি হবে। সারাবিশ্বেই অ্যাপের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন রেভিনিউ বড় ভূমিকা পালন করে।
আমাদের দেশের একটি ছেলে অ্যারাবিক ডিকশনারি নামে একটি অ্যাপ বানিয়েছে, যেটি আইফোনের সেরা দশ অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। প্রতি মাসে তার অ্যাপে ৬০০ মিলিয়ন ইমপ্রেশন পড়ে। এগুলো অর্গানিক পদ্ধতিতে হয়েছে। সে কিন্তু শুরুতেই বিশাল বড় বিনিয়োগ নিয়ে নামেনি। এখন সে একটি বৈশ্বিক ডিকশনারি কোম্পানি খুলে নানা দেশের ডিকশনারি বানাচ্ছে। আমরা এখানে বসেও চিন্তা করতে পারি সৌদি আরবের ৬ লাখ বাঙালির জন্য কী অ্যাপ বানাতে পারি। সেখানে যদি ২ লাখ মানুষও আমার অ্যাপ ব্যবহার করে তাহলে সেখান থেকেও রেভিনিউ আনা সম্ভব। রেভিনিউয়ের নানা উপায় আছে। আগে একটা উদ্ভাবন করতে হবে। তারপর রেভিনিউ কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের তো পুরো ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা_ খুব একটা উদ্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ একটা বড় রকমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশে সব থেকে বেশি আলোচিত শব্দটি হচ্ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। বুঝে না বুঝে সাধারণ মানুষ আজকাল ভালো কিছু হলেই বলে ওঠে ‘ডিজিটাল’। আর যে শব্দগুলোর সাথে আমরা আরও পরিচিত হয়েছি তার মধ্যে বিলিয়ন ডলার, ফ্রিল্যান্সার, মার্কেট প্লেস, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি। ২০১৮ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করা আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু শুধু লক্ষ্য থাকলেই হবে না, তার জন্য প্রযুক্তি-বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ প্রয়োজন।
হাইটেক পার্ক হচ্ছে-হবে_ এ রকম অনেক দিন থেকেই শুনতে পাচ্ছি। কিছু দিন আগেই প্রযুক্তিভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু কম দামে জায়গা বরাদ্দ দিলেই কি হবে? কীভাবে এই কোম্পানিগুলোর লোকজন আসা-যাওয়া করবে, কোথায় থাকবে, ইন্টারনেটের স্পিড কী হবে, পাওয়ার সাপ্লাই কতোটুকু নিশ্চিত ইত্যাদি করতে হবে। শুরুর দিকে একটু বেশিই সুবিধা দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রযুক্তি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই সহজ শর্তে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। আসল বিষয়টা হলো হাইটেক পার্ক মানেই একগাদা সুবিধা, যা চাইলেও ঢাকায় পাওয়া যাবে না বা অনেক বেশি মূল্যে পাবে। ঢাকার বাইরে হাইটেক পার্কগুলো যতোদিন না হবে ততোদিন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ঢাকার ভেতরেই ভালো কয়েকটা আস্ত বাড়ি বেছে নিয়ে পার্কের সুবিধাসহ কম সময়ে গড়ে তোলা যায়_ এই রকম ভাবা যেতে পারে।
একটা জিনিস খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সারাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ছোট-বড় একদিনের পাঁচ দিনের এক মাসের বা ছয় মাসের নানা বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। অনেকেই নানারকম সমালোচনা করেন, কেউ ভালো বলেন। সরকারি প্রশিক্ষণগুলো প্রায় বিনা পয়সাতেই হয়। বেসরকারিগুলোর ফি নির্ধারিত থাকে। যে কোনো প্রশিক্ষণ ঘোষণা হলেই আবেদনের লম্বা লাইন দেখেই বোঝা যায় আমাদের তরুণদের শেখার দারুণ আগ্রহ আছে। যে যতোই সমালোচনা করুক; মেধাভিত্তিক একটি ভবিষ্যৎ জাতি প্রস্তুতের জন্য কলেজ-ইউনিভার্সিটির বাইরে বিশেষায়িত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, পর্যাপ্ত ফলোআপ এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে ধীরে ধীরে সংযোগ ঘটাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের আগে স্থানীয় অনলাইন বাজার গড়ে তুলতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, এই প্রশিক্ষিত তরুণরা স্থানীয় বাজারে কাজ করে হাত পাকাবে। তারপর নিজে থেকেই বিদেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। ইংরেজিতে কথা বলা ও লেখা যেহেতু একটা বড় সমস্যা, এর জন্য আমাদের গার্মেন্টের বায়িং হাউস কনসেপ্টের মতো ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গড়ে উঠতে পারে, যাদের কাজ হবে বায়ার ও দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া।